ঢাকা, নভেম্বর ২৭ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ঈদুল আজহা উদযাপনে প্রস্তুত সারা দেশ। মুসলিমদের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হবে শনিবার। ঈদের জামাতের জন্য প্রস্তুত জাতীয় ঈদগাহ ময়দানসহ জামে মসজিদগুলো। তবে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে রওনা হওয়া নগরবাসীদের অনেককে পোহাতে হয়েছে মহাসড়কের যানজট ভোগান্তি। গাড়ি সঙ্কটে অনেকে শুক্রবার রাতেও ছিল পথে। অনেকে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলো গাড়ির অপেক্ষায়। শুক্রবার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলমুখী দুই মহাসড়কে দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে অনেকের। তাই তাদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটানোর সময় অনেকটাই খরচ হয়ে যায় পথে পথে। যানজট নিরসনের পুলিশ কী করছে- জানতে চাওয়া হলে হাইওয়ে পুলিশ সুপার আনোয়ার কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "৮ ঘণ্টার যাত্রা ১৬ ঘণ্টায় হচ্ছে, তাতে কী? তবুও তো মানুষ যেতে পারছে। গাড়ি ধীরে চললেও থেমে তো নেই।" যাত্রীদের অভিযোগ যানজট সামাল দিতে পুলিশ সক্রিয় নয়। নীলফামারীগামী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক মহসীনুল করিম শুক্রবার দুপুরে সাভারের বাইপাইল থেকে জানান, তার গাড়ি প্রায় দুই ঘণ্টা সেখানে আটকে থাকলেও তিনি কোনো পুলিশ দেখেননি। তবে যাত্রীদের অভিযোগ নাকচ করে আনোয়ার বলেন, "যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পুলিশ সদস্যের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারাও রাস্তায়। পুলিশ চেষ্টা করছে, কিন্তু করার কিছু নেই।" যানজটের মধ্যে সাভারের ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে দুই অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যকে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল, বলেন দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক জামিউল আহসান শিপু। যানজটের কারণ কী- জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা আনোয়ার বলেন, "হঠাৎ করেই সড়কে গাড়ির সংখ্যা ৫/৬ গুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু রাস্তা যে রকম ছিলো, সে রকমই আছে; তাই এই যানজট।" ঈদে গাড়ির সংখ্যা অপ্রতুল গাড়ি থাকায় অনেক আনফিট (আইনত চলাচলের অযোগ্য) গাড়ি পথে নেমেছে। আর এসব গাড়ি সড়কে বিকল হয়ে যানজট বাড়াচ্ছে বলে জানান আনোয়ার। মহাসড়কে গাড়ি আটকে থাকায় বাসগুলো নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে পারেনি। ফলে যাত্রীদের অপেক্ষার পালা হয়েছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। কুমিল্লাগামী যাত্রী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর সহ সম্পাদক এহেছান লেনিন সকাল ৫টায় সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়েও কোনো বাসে উঠতে পারেননি। "গতকালও দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থেকে ফিরে যেতে হয়। আজও ভোর থেকে অপেক্ষায় আছি। কিন্তু কোনো বাস নেই। দেখি কী করা যায়', বেলা ১২টার সময় বলেন তিনি। সায়েদাবাদে লেনিনের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন হাজার হাজার যাত্রী। বাস না থাকার বিষয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বলেন, মহাসড়কে তীব্র যানজটের কারণে বাসগুলো আসতে অনেক দেরি হচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর যে কয়েকটি বাস আসছে, নারী ও শিশুদের পক্ষে তাতে চড়া অসম্ভব ব্যাপার। বাসের ছাড়ে উঠেও অনেকে চলছেন। আর বাসগুলো দুই থেকে তিনগুণ বেশি ভাড়া নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন যাত্রীরা। কক্সবাজারের যাত্রী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক মইনুল হক চৌধুরী বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় ফকিরাপুল থেকে বাসে চড়েন। সাড়ে ১১টায় সায়েদাবাদ থেকে বাস ছাড়ে। কিন্তু শুক্রবার দুপুর ১২টায় তিনি মাত্র কুমিল্লার দাউদকান্দি পার হয়েছেন। স্বাভাবিক সময়ে দাউদকান্দি পার হতে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা লাগলেও যানজটে তা ১৩ ঘণ্টা দীর্ঘ হয়েছে। শুক্রবার রাত ১০টায়ও বাড়ি পৌঁছাতে পারেননি মইনুল। ১২ ঘন্টা অপেক্ষা করেও পঞ্চগড়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার গাড়ি না পেয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর প্রতিবেদক গোলাম মর্তুজা অন্তু ঢাকার কাছে ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় বোনের কাছে ঈদ করতে গেছেন। নগরীর গাবতলী বাস টার্মিনালের চিত্রও একই। গাবতলী থেকে নবীনগর পর্যন্ত ব্যাপক যানজট রয়েছে। একই অবস্থা টাঙ্গাইলের দিকেও। যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা নেই বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। দুপুর দেড়টার দিকে নীলফামারীগামী যাত্রী মহসীনুল করিমের বাসটি জটে আটকা ছিলো নবীনগর-টাঙ্গাইল সড়কের ডিইপিজেড এলাকায়। গাবতলী থেকে তার বাস ছেড়েছে বৃহস্পতিবার রাত ৩টায়। মহসীনুল বলেন, "টিকিট ছিলো রাত ১০টার, বাস ছেড়েছে ৩টায়। ১০ ঘণ্টায়ও ঢাকা পার হতে পারিনি, কখন পৌঁছাবো বুঝতে পারছি না।" তবে নবীনগর থেকে আরিচার দিকে জট তেমন নেই বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। পুলিশ, বাস শ্রমিকরা জানায়, বিভিন্ন স্থানে মহাসড়কের পাশে কুরবানির পশুর হাট বসায় যানজট দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়ক লাগোয়া বিভিন্ন হাট-বাজারে ঈদের আগের ভিড়ও জট বাড়িয়ে তুলেছে। বরাবরের মতোই রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল ৯টায়। এতে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিচারপতি, কূটনীতিক ও রাজনীতিকসহ সর্বস্তরের নাগরিক অংশ নেবেন। প্রধান জামাতের পাশে পর্দা দিয়ে মহিলাদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের স্ত্রীদের জন্যও আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে সেখানে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া পৃথক বাণীতে দেশবাসীসহ মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তারা মুসলিম উম্মার সুখ এবং সমৃদ্ধিও কামনা করেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, "একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ বিনির্মাণে ঈদুল আযহার ত্যাগের মহান শিক্ষাকে আমাদের চিন্তা ও কর্মে প্রতিফলিত করতে হবে। ঈদুল আযহা মুসলিম জাতির ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে আরো সুসংহত করবে বলে আমার বিশ্বাস।'' প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে ঈদুল আযহার মর্মবাণী উপলব্ধি করে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী কর্মকান্ডে অংশ নিয়ে বিভেদ-বৈষম্যহীন একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে গড়ার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ''প্রিয়বস্তুকে আল্লাহর উদ্দেশে উৎসর্গের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের যে অনুপম দৃষ্টান্ত হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্থাপন করে গেছেন, তা বিশ্ববাসীর জন্য চিরকালই অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।" খালেদা জিয়া বলেন, "আত্মস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা কোরবানীর প্রধান শিক্ষা। হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-ক্রোধকে পরিহার করে সমাজে শান্তি ও সপ্রীতি প্রতিষ্ঠায় আত্মনিবেদিত হওয়া আমাদের কর্তব্য।" ঈদের দিন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান কূটনীতিকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। সকাল সাড়ে ১০টায় রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও মিশন প্রধানসহ কূটনীতিক এবং ১১টায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। ওদিকে, সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে শুক্রবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঈদ উদযাপিত হয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এজে/এমআই/জিএনএ/২১৩০ ঘ. |